-তাসনিয়া অন্তি
আগামীকাল শ্বশুরবাড়িতে আমার প্রথম ঈদ উদযাপন হতে যাচ্ছে।
এখন ঈদের আগের দিনের রাত, ইফতারি কোনো রকম শেষ করেই বাড়ির সবাই চাঁদ দেখতে গিয়েছে ছাদে। আমার ছোট ননদ আমাকে কয়েকবার ডাকলো কিন্তু সব কিছু এলোমেলো যার কারণে আমি তাদের সাথে যোগদান করতে পারিনি। আমি আর বুয়া মিলে সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছি।
মাত্র একটা বছর আগে ঠিক এই দিনেই কোনো রকম একটু শরবত মুখে দিয়েই আমিও আমার কাজিনদের সাথে ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখেছি। অজস্র তারাবাজি, কালিপটকা, আতশ বোমা ফুটিয়েছি। কিন্তু এই মাত্র একটা বছরের ব্যাবধানে আমিও আমার মায়ের মতো সংসারের কাজে লেগে গিয়েছি। ভাবতেও অবাক লাগে এই আমার ননদ সেও একদিন আমার মতো এই জায়গায় দাঁড়িয়েই এইটাই ভাববে আবার আমার মেয়ে হলে সেও একদিন আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের সংসারের কাজ করবে আর সবটা ভাববে হয়তো তার চোখে পানি এসে যেতে পারে আবার নাও আসতে পারে।
- বউমা?
- "জি মা। কিছু বলবেন?" পেছন থেকে ডাক দিলেন আমার শাশুড়ি মা।
- হ্যাঁ মা। তুমি একটু হাতের কাজ গুছিয়ে নিধি( আমার ননদ) আর ওর কিছু বান্ধবী আসবে। ওদের সবাইকে একটু মেহেদী লাগিয়ে দিও মা। তুমি নাকি খুব সুন্দর মেহেদী লাগাতে পারো। আমার মেয়েটা খুব লাজুক তো, তাই তোমাকে বলতে লজ্জা পাচ্ছে।
- আরে মা লজ্জার কী আছে? নিধি সরাসরি আমাকেই বলবে। এইখানে লজ্জার কী আছে, দাড়ান মা ও আগে আসুক।
বলা বাহুল্য আমার শাশুড়ী মা অনেক ভালো মানুষ, শুধু সে নয় এই পরিবারের সকলেই অনেক ভালো, আমাকে অনেক ভালো বেসেছে। তারপরেও একসাথে থাকতে গেলে অনেক ধরনের মনোমালিন্য হয়ে থাকে, আমার মায়ের কড়া নিষেধ এইসব নিয়ে মুখ গোমড়া না করতে আর আমার স্বামীকে বা আমার মায়ের কাছেই কখনও নালিশ না করতে। আমি সেইটাই করি, কী দরকার!। তারাই এখন আমার পরিবার, আমার আপন লোক।
হাতের কাজ গুছিয়ে রাতের রান্না করে আবার ঈদের দিন সকালে যেগুলো মা রান্না করবেন, সেসব টুকটাক গুছিয়ে বসে পড়লাম মেহেদী দিতে। নতুন বউয়ের হাতের সুনিপুণ মেহেদী লাগানো দেখতে পাশের বাড়ির আমার চাচী শাশুড়ীরাও এসে হাজির। কেউ ডিরেকশন দিতে লাগলো, এমন না অমন হলে আরো ভালো হবে। একটু সিম্পল বা আরো একটু গর্জিয়াস। সবটাই আমার গ্রহণ করতে হচ্ছে মুখের কোণে এক চিমটি হাসি মাখিয়ে।
এই আমি বিয়ের আগে কেউ আমার কোনো কাজে খুঁত ধরতে এলে বা বেশি জ্ঞান দিতে এলে মুখের উপর বলে দিতাম তাহলে আপনি/তুমি করুন। এত ভালো পারেন। কিন্তু সেই উপক্রম আপাতত আমার নেই, অনেকটা ধৈর্য এসে গিয়েছে মনের উপর।
" সংসার জীবনটাই হয়তো এমন। ধৈর্যের কাছে হেরে গেলেই আপনি তীব্র গতিতে সংসারের কাছে হেরে যাবেন।"
একটানা আটজনকে মেহেদী পরিয়ে আমি আপাতত বিধ্বস্ত। হাতের অবস্থা কাহিল, তখন আমি দেখলাম আমার শাশুড়ী মা খুবই কৌতূহল দৃষ্টিতে আমার ননদের হাতের দিকে তাকিয়ে বলছে,
-" বাহ্! কি সুন্দর করে মেহেদী দিয়েছে তোর ভাবি! খুবই সুন্দর লাগছে।"
তার কথা শেষ হতে না হতেই আমি এগিয়ে গেলাম তার কছে,
-" মা? আসুন আপনাকে দিয়ে দেই।"
-আরে না। আমি বুড়ো মানুষ এইসব নিবো না। তুমি নাও মা।
-না মা আমি পরে নিবো। আসুন আপনাকে দিয়ে দেই।
আমার শাশুড়ি আর কথা বললেন না। খুবই উৎফুল্ল মনে হাত এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। মনের মাধুরী মিশিয়ে তাকে মেহেদী লাগিয়ে দিলাম।
কিছুক্ষণ বাদেই নাজিফ ( আমার স্বামী ) বাসায় এলো। সবার হাতে মেহেদী দেখে সে খুবই খুশি হলো, বেশি খুশি হলো তার মায়ের দিকে তাকিয়ে। সবাইকে খুশি দেখে আমারও অনেক ভালো লাগলো। তাকে খাবার দিয়ে, আরো কিছু কাজ গুছিয়ে, সকালের জন্য দুই প্রকার মিষ্টি রান্না করে অবশেষে আমি আমার রুমে এলাম। নাফিজ টিভি দেখছে,
- " কী ব্যাপার ব্যস্ত বউ? ঘরে স্বামী আছে খেয়াল আছে আপনার? "
- খেয়াল আছে বলেই তো এইখানে আমি মিস্টার।
- অত কথা ছাড়ো। তোমার হাতে মেহেদী কোথায়? এক্ষুনি লাগাও। তুমি তো জানো আমি মেহেদী কতো পছন্দ করি। দুহাতে মেহেদী না থাকলে আমার বউটাকে একটুও মানায় না। আর তুমি এমনিতেই মেহেদী কতো পছন্দ করো।
- কাহিল কণ্ঠে আমি বললাম, 'আমার এনার্জি নেই, প্রিয়।কালকে দুপুর পর লাগাবো।"
- না না এক্ষুনি। না হলে তুমি নিয়ে এসো আমি লাগিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। কথাটা বলতে বলতে নাফিজের মোবাইলে একটা কল আসলো।
-" হ্যালো? কী রে ব্যাটা? জানোস না আজকে আমাদের পার্টি আছে। বিয়ে কইরা তুমি খুব ভাবে আছো, তাই না? ভাবিরে দে, তারে একটু বলি তোকে যেনো কিছু সময়ের জন্য আমাদের হাতে একটু সমর্পণ করে।"
নাফিজ বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে বলতে লাগলো সে যেতে পারবে না আজকে, একটু কাজ আছে। একটু আগেই বাসায় ফিরেছে। তাদের কথার এক পর্যায়ে আমি বললাম,
-" তুমি যাও। তারা তোমার বন্ধু, প্রতিবার মজা করেছো। এইবার না গেলে ওরা কী ভাববে।"
- এক গাল হেসে নাফিজ আমার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বললো, " এত ভালো কেনো আমার পাগলীটা। আচ্ছা তুমি ঘুমিয়ে যেও না। আমি দ্রুতই চলে আসবো। তোমার হাতে মেহেদী দিয়ে দিবো। অবশ্যই অপেক্ষা করবে আমার জন্য।"
- নাফিজকে বিদায় জানিয়ে আমি আমার বিছানায় লুটিয়ে পড়লাম। নিজের ব্যবহৃত মোবাইলটা একটু চেকিং দিয়ে দেখলাম আমার আম্মু ফোন দিয়েছিল কিন্তু ব্যস্ততার ভিড়ে মায়ের ফোনটা ধরা হয়নি। আবার বান্ধবীদের এসএমএস দেখলাম। সবাই ঈদ মোবারক পাঠিয়েছে। অনলাইনে আসিনি কেনো সেইগুলোও বলেছে। তাদের এসএমএস গুলো পড়তে পড়তে মেসেঞ্জারে ঢোকার সময়টাও হলো না আমার। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম!
রাতের বেলায় ক্লান্ত দেহটা সব সামাজিকতার উর্ধ্বে অবস্থান করে। তখন দুহাত ভরে মেহেদী নেওয়ার প্রবল ইচ্ছাটা নেহাত ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই লাগে না।
No comments:
Post a Comment